মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

পটভূমি

বৃটিশ শাসকের পূর্বে যখন যে শাসক ক্ষমতায় এসেছে তখন তাদের সুবিধা ও ইচ্ছা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার গঠিত হতো। ১৮১৬ এবং ১৮৯১ সালে স্থানীয়ভাবে ফেরী ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, সড়ক / সেতু নির্মাণ ও মেরামতের জন্য বৃটিশ সরকার কর্তৃক কর ধার্যের আইন প্রণীত হয়। এ সম্পর্কে সরকারকে পরামর্শদানের জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সচিব করে প্রতিটি জেলায় একটি স্থানীয় কমিটি গঠিত হয়। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর দেশের অর্থনীতি ও আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বৃটিশ সরকার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্দি করে এব ১৮৭০ সালে বেঙ্গল চৌকিদারী আইন প্রণয়ন করে।

১৮৭০ সালে চৌকিদারী আইন পাশের মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলে এক স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। এ আইনের অধীনে কয়েকটি গ্রামকে ইউনিয়নে অন্তর্ভূক্ত করে প্রতিটি ইউনিয়নে ৫ সদস্য সমন্বয়ে চৌকিদারী পঞ্চায়েত গঠন করা হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পঞ্চায়েতের সকল সদস্যকে ৩ বৎসরের জন্য নিয়োগ করতেন। পঞ্চায়েত গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক প্রশাসনকে আইন শৃংখলা রক্ষা এবং রাজস্ব আদায়ে সহায়তা করা।

তৎকালীন সরকার জনগণের অংশ গ্রহণ ছাড়া কোন উন্নয়ন কর্মসূচী সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয় অনুবাধন করে মিঃ ভি এইচ স্কালচ এর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। উক্ত কমিটির সুপারিশক্রমে ১৮১৭ সনে তৎকালীন বৃটিশ লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে জিলা বোর্ড মেস কমিটি বিল উত্থাপিত হয় এবং ঐ বছরেই তা আইনে পরিণত হয়। এ আইনের অধীন প্রতিটি জেলায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে জেলা বোর্ড মেস কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটির এক-তৃতীয়াংশ সদস্য ছিলেন সরকারী কর্মচারী এবং দু-তৃতীয়াংশ সদস্য ছিলেন বেসরকারী। বেসরকারী সদস্যরাও সরকার কর্তৃক মনোনীত হতেন। এ কমিটির প্রধান কাজ ছিল করের হার নির্ধারণ, কর আদায় এবং রাসত্মাঘাট নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় মেরামত কাজে অর্থ ব্যয় হয়। ১৮৭৮ সাল হতে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত এ কমিটির অস্তিত্ব ছিল। স্থানীয় সরকার গঠনের এটিই ছিল প্রাথমিক পদক্ষেপ।

স্থানীয় সরকার গঠনের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে জিলা বোর্ড মেস কমিটি দীর্ঘ ১৪ বৎসর এর অস্তিত্ব বজায় রাখলেও এ কমিটি সামগ্রিকভাবে জনগনের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। অবশ্য এর যথার্থ কারণও ছিল। এ কমিটি ছিল সম্পূর্ণভাবে সরকারী কর্মচারীদের দ্বারা প্রভাবিত। যার ফলে কমিটির কার্যক্রমে জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের সুযোগ ছিলনা। অথচ স্থানীয় সমস্যা সমাধানে জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া তাদের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন কোনক্রমেই সম্ভব ছিলনা। এছাড়া মেস কমিটির অধীন এলাকা ছিল বিস্তৃত। সরকারী সদস্যদের সদস্যদের স্থানীয় সমস্যা সমাধানে অভিজ্ঞতা ও স্বতঃস্ফুর্ত উদ্যোগের ছিল অভাব। রাস্তাঘাট নির্মাণ ও অন্যান্য স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজ ছাড়াও গণস্বাস্থ্য, শিক্ষা প্রভৃতি মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে সে কমিটি কোন কার্যকরী তৎপরতার স্বাক্ষর রাখতে পারেনি। মেস কমিটির অভিজ্ঞতার আলোকে ১৮৮৫ সালে লোকাল সেলফ গভর্ণমেন্ট এ্যাক্ট প্রণীত হয়। স্থানীয় সরকার গঠনে এ এ্যাক্টই উপমহাদেশের যুগামত্মকারী অবদান রাখে।

১৮৮৫ সালের লোকাল সেলফ গভর্ণমেন্ট এ্যাক্ট বলে তৎকালীন বাংলার ১৬টি জেলায় বিভিন্ন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড গঠিত হয়। ১৬টি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড ছিলঃ ঢাকা, চবিবশ পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, যশোর, খুলনা, হুগলী, হাওড়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম, ফরিদপুর, পাবনা ও পাটনা। ১৮৮৬ সালের ২১শে মার্চ অপর এক গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মহকুমাভিত্তিক নির্বাচিত ও মনোনীত সদস্য সংখ্যা প্রকাশ হয়।

লোকাল সেলফ গভর্ণমেন্ট এ্যাক্ট বলে প্রত্যেক জিলার প্রত্যেক মহকুমায় লোকাল বোর্ড গঠিত হয়। এ লোকাল বোর্ডই ডিষ্ট্রিক বোর্ডের নির্বাচক মন্ডলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করত। লোকাল বোর্ডের সদস্যদের ভোটেই ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হতো। ১৮৮৬ সালের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ১৯২০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ডিষ্ট্রিক্ট ম্যাজিষ্ট্রেট চৌকিদার বলে ডিষ্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হতেন। ১৯৩৬ সনে লোকাল সেলফ গভর্ণমেন্ট এ্যাক্ট জনপ্রনিধিত্বশীল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপলাভ করে এবং এ ধারা ১৯৫৭ সন পর্যমত্ম বলবৎ থাকে।

১৯৫৯ সনে মৌলিক গণতন্ত্র আদেশের অধীন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডকে নতুন আংগিকে পরিণত করে ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল নামকরণ করা হয়। এ আদেশে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের ভোটে ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচনের বিধান সহকারী নির্বাচিত সদস্যদের সমান সংখ্যক জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে চেয়াম্যান এবং নির্বাচিত সদস্যদের মধ্য থেকে একজন ভাইস-চেয়ারম্যান পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হতেন। এ ব্যবস্থায় ১৯৬৩ সালে জেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচন হয়। দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ ১৯৬৬ সনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭২ সনে নির্বাচিত পরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে অন্তবর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে জেলা প্রশাসককে এর প্রশাসক করে ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের যাবতীয় কার্যাবলী পরিচালনা ও তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা অর্পণ করা হয় এবং ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের স্থলে জেলা বোর্ড নামকরণ করা হয়। ১৯৭৬ সনের স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ জারী হয় এবং জেলা বোর্ডের নাম করা হয় জেলা পরিষদ। এই অধ্যাদেশে জেলা পরিষদের কর্মপদ্ধতি এবং পরিষদকে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংস্থা হিসেবে রূপ দেয়ার উদ্দেশ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়। নির্বাচন না হওয়া পর্যমত্ম জেলা প্রশাসককে এর চেয়ারম্যান হিসেবে পরিষদরে দায়িত্ব পালনের বিধান রাখা হয়।

স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইন, ১৯৮৮ এর ধারা ৪(১) অনুযায়ী প্রতিনিধি সদস্য, মনোনীত সদস্য, মহিলা সদস্য এবং কর্মকর্তা সদস্যগণের সমন্বয়ে জেলা পরিষদ গঠন করা হয়। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সরকার কর্তৃক গেজেট বিজ্ঞপ্তির দ্বারা নিযুক্ত হতেন। এ বিধা অনুযায়ী বিগত ১০/০৮/১৯৮৯ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটে এক বিজ্ঞপ্তির দ্বারা ৬১টি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়। এরা সকলেই সংসদ সদস্য ছিলেন। উক্ত আইনের ৫(৫) ধারার আওতায় নিযুক্ত/মনোনীত চেয়ারম্যানকে সরকার কোন কারণ বা দর্শানো ব্যতিরেকে যে কোন সময় অপসারণ করতে পারতেন। জেলা পরিষদের কার্যকাল ছিল তিন বছর।

জেলা পরিষদ আইন, ২০০০ এ পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিতে ১জন চেয়ারম্যান, ১৫ জন সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনের ৫ জন মহিলা সদস্য সমন্বয়ে পরিষদ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ নির্বাচক মন্ডলীর ভোটে নির্বাচিত হবার বিধান রয়েছে। এ আইনে পরিষদের মেয়াদ ৫ বছর করা হয়েছে এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পদত্যাগ/অপসারণের বিধান আছে। সংশ্লিষ্ট জেলার মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দকে পরিষদের উপদেষ্টা রাখারও উলেস্নখ আছে। পরিষদের নির্বাহী ক্ষমতা চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রত্যক্ষভাবে অথবা পরোক্ষভাবে প্রযুক্ত হবার বিধান রাখা হয়েছে। জেলা পরিষদ আইনে উপ-সচিব পদমর্যাদার একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার একজন সচিব প্রেষণে পরিষদে ন্যস্ত রাখার বিধান আছে। এই আইনে পরিষদের সাচিবিক দায়িত্ব প্রেষণে নিয়োজিত সরকারী কর্মকর্তাদের দ্বারা পালনের / নিষ্পন্নের বিধান রাখা হয়েছে।